নিউজ ডেক্স:
জ্বালানি তেলের দাম: জনগণের মত কোথায়?
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে বা কমে কিন্তু সাধারণ মানুষ জানতে পারে সিদ্ধান্তের খবর, সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের মূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিইআরসি গণশুনানি করতে পারলেও জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা এখনো সরকারের জ্বালানি বিভাগের হাতেই। প্রতি মাসে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। ফলে যে পণ্যের মূল্য সরাসরি পরিবহন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা এবং মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে, সেই মূল্য নির্ধারণে স
াধারণ ভোক্তার সরাসরি বক্তব্য রাখার কোনো গণশুনানি নেই। এর পেছনে জ্বালানি বিভাগের যুক্তিও রয়েছে। তাদের বক্তব্য, আগে থেকে দাম বৃদ্ধির বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ব্যবসায়ী বা ভোক্তাদের একাংশ অতিরিক্ত তেল মজুত করতে পারে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে জনদুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেক সময় মূল্য পরিবর্তনের ঘোষণা কার্যকর হওয়ার মাত্র এক-দুই ঘণ্টা আগে দেওয়া হয়। যুক্তিটি জনদুর্ভোগ এড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো জনদুর্ভোগ ঠেকানোর ব্যবস্থা কি মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতার বিকল্প হতে পারে? কারণ তেলের দাম শুধু একটি পণ্যের দাম নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পরিবহন ব্যয়, কৃষির উৎপাদন খরচ, পণ্য পরিবহন, শিল্পের ব্যয় এবং বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে বিইআরসি গণশুনানি করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য নির্ধারণেও কমিশন শুনানি করেছে। এলপিজি, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের দামও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিইআরসি নির্ধারণ করে। তাহলে একই জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা কেন? বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে বিইআরসি’র পাশাপাশি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুযোগ রেখে আইন করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুনে সেই ব্যবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ওই আইন বাতিল করলে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে বিইআরসি আবার গণশুনানির ক্ষমতা ফিরে পায়। অর্থাৎ বিদ্যুতের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক কমিশনের শুনানি ফিরে এসেছে, গ্যাসের ক্ষেত্রেও শুনানি হচ্ছে, অন্যান্য কয়েকটি জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তই বহাল রয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম মন্ত্রণালয় সমন্বয় করে। তবে ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রে বিইআরসি শুনানি করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে। এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে যদি আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য অর্থনৈতিক হিসাব বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে সেই হিসাব জনগণের সামনে উপস্থাপনে সমস্যা কোথায়? দাম বাড়ানোর আগে দীর্ঘ গণশুনানি করলে মজুতের ঝুঁকি থাকলে, স্বচ্ছতার অন্য কোনো কার্যকর পদ্ধতি কি তৈরি করা যায় না? মূল্য নির্ধারণের সূত্র, আন্তর্জাতিক বাজারের দর, আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক ও সরকারের রাজস্ব এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা কি সম্ভব নয়? কারণ জনগণ শুধু জানতে চায় না তেলের দাম কত হলো। জনগণ জানতে চায় কেন হলো, কোন হিসাবের ভিত্তিতে হলো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারে তার প্রভাব কত দ্রুত পড়বে? জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে স্বচ্ছতা, তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহিও থাকা জরুরি। কারণ তেলের দামের প্রতিটি পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটেই।

