মৌলভীবাজার কমলগঞ্জ প্রতিনিধি
৫০০ টাকা মজুরি আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা, গ্রেফতার গীতা কানু
চা শ্রমিকদের ৫০০ টাকা মজুরির দাবিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত মৌলভীবাজারের চা-বাগানপাড়া। আন্দোলন, বিরোধ, সংঘাত ও ভাঙচুরের অভিযোগের মধ্যে এবার গ্রেফতার হলেন চা শ্রমিক আন্দোলনের আলোচিত নেত্রী গীতা কানু। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে মৌলভীবাজার শহর থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। পরে শ্রীমঙ্গলে সংঘাত-ভাঙচুরের ঘটনায় নিপেন দাসের দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তার গ্রেফতারের খবরে চা-বাগানগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও চাপা উত্তেজনা। চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের আন্দোল
ন কতটা যৌক্তিক আর সেই আন্দোলনের আড়ালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি না গীতা কানুর গ্রেফতারের পর এখন সামনে এসেছে এমন একাধিক প্রশ্ন। একদিকে শ্রমিকদের দাবি ও আন্দোলনের অধিকার, অন্যদিকে সংঘাত-ভাঙচুরের অভিযোগ দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পুরো ঘটনাটি। পুলিশের ভাষ্য, ঘটনাটি কেবল মজুরি দাবির আন্দোলনে সীমাবদ্ধ ছিল না; সংঘাত, ভাঙচুর এবং এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ওই মামলার ভিত্তিতেই গীতা কানুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্ষুণ্ন করা এবং সংঘাত-ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। তবে গ্রেফতারকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। স্থানীয় একটি সচেতন মহলের অভিযোগ, চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও আবেগকে সামনে রেখে আন্দোলনকে এমন পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে উত্তেজনা ও সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগও তুলছেন। অন্যদিকে গীতা কানুর সমর্থক ও সাধারণ চা শ্রমিকদের একটি অংশ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ের আন্দোলন দমিয়ে রাখতেই মামলাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের দাবি, গীতা কানু শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলার কারণেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখানেই সামনে আসছে মূল প্রশ্ন একজন শ্রমিক নেত্রীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কতটা সত্য, সংঘাত ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, আর চলমান শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে এসব ঘটনার প্রকৃত সম্পর্কই বা কতটুকু? এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। গীতা কানুর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থান পরিবর্তনকে কোনো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকাও কাউকে সংঘাত বা ভাঙচুরের অভিযোগ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্ত করে না। প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে প্রয়োজন তথ্য, সাক্ষ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত সিদ্ধান্ত। এদিকে গ্রেফতারের পর চা-বাগানগুলোতে বাড়ছে উদ্বেগ। শ্রমিকদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও পরিস্থিতি যাতে নতুন করে সংঘাতের দিকে না যায়, সে জন্য প্রশাসনের সতর্ক ও নিরপেক্ষ ভূমিকা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। চা শ্রমিকদের ৫০০ টাকা মজুরির দাবি তাদের জীবিকা ও অধিকারসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই দাবিকে উপেক্ষা করার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি দাবি আদায়ের নামে সংঘাত, ভাঙচুর বা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগ থাকলেও তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই গীতা কানুর গ্রেফতার এখন শুধু একটি মামলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে চা শ্রমিকদের অধিকার, আন্দোলনের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় রাজনীতির নানা প্রশ্ন। এই ঘটনায় কে সত্য বলছে, আর কার অভিযোগের পেছনে কতটা বাস্তবতা তা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। আর চা-বাগানের হাজারো শ্রমিকের প্রত্যাশা একটাই ন্যায্য দাবি যেন সংঘাতের রাজনীতিতে হারিয়ে না যায়, আবার আইনের শাসনও যেন কোনো পক্ষের চাপে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

