স্টাফ রিপোর্টার
প্রমাণ কোথায়? ডা. এস এম সরওয়ারকে ঘিরে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি
ক্যান্সারের মতো জটিল ও প্রাণঘাতী রোগ নিয়ে চিকিৎসা ও গবেষণায় যুক্ত অধ্যক্ষ ডা. এস এম সরওয়ারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন আর কে কী বললেন তা নয়। প্রশ্ন হলো, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ কোথায়? সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ডা. এস এম সরওয়ারের চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর প্রসঙ্গ, তাঁর চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন এবং অর্থসংক্রান্ত অভিযোগ উঠে এসেছে বলে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের জবাবে ডা. সরওয়ার সেগুলোকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্
যান করেছেন। এখন বিষয়টি আবেগের নয়; এটি প্রমাণের। একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ‘ভুল চিকিৎসা’, ‘অবহেলা’ কিংবা ‘অর্থ আত্মসাতের’ মতো অভিযোগ সাধারণ কোনো অভিযোগ নয়। এগুলো একই সঙ্গে তাঁর পেশাগত সুনাম, রোগীদের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসাসেবার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এমন অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত নথি, প্রমাণ, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য। একজন রোগীর মৃত্যু কিন্তু মৃত্যুর কারণ কী? ক্যান্সার রোগীর মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা। কিন্তু কোনো রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এই তথ্য একাই চিকিৎসকের ভুল প্রমাণ করে না। আবার মৃত্যুকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়াও যথেষ্ট নয়। তাই প্রত্যেকটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। রোগী যখন চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন তখন তাঁর ক্যান্সারের পর্যায় কী ছিল? রোগ নির্ণয়ের রিপোর্ট কী বলছিল? আগে কোথায় চিকিৎসা নিয়েছিলেন? কী কী ওষুধ বা চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল? চিকিৎসার সময় কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছিল কি না? মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ কী? মৃত্যুর আগে চিকিৎসা-নথিতে কী উল্লেখ ছিল? স্বাধীন কোনো বিশেষজ্ঞ সেই চিকিৎসা পর্যালোচনা করেছেন কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু ‘চিকিৎসার পর রোগী মারা গেছেন এমন তথ্য দিয়ে ‘ভুল চিকিৎসা’ প্রতিষ্ঠা করা বৈজ্ঞানিক বা সাংবাদিকতাগতভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। মৃত্যু একটি ঘটনা; ভুল চিকিৎসা একটি প্রমাণযোগ্য অভিযোগ। দুটিকে এক করে ফেলা হলে সত্য অনুসন্ধানের পথই বন্ধ হয়ে যায়। অর্থ আত্মসাতের’ অভিযোগেও চাই হিসাবের খাতা ডা. এস এম সরওয়ারের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে বলে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এমন অভিযোগ সত্য হলে তার পক্ষে অবশ্যই আর্থিক প্রমাণ থাকার কথা। রোগীর কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে? কীসের জন্য নেওয়া হয়েছে? কোনো রসিদ বা হিসাব রয়েছে কি? চিকিৎসার নামে নেওয়া অর্থের সঙ্গে কথিত আত্মসাতের সম্পর্ক কী? সংশ্লিষ্ট রোগী বা স্বজনের অভিযোগের পক্ষে কী নথি রয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ‘অর্থ আত্মসাৎ’ শব্দটি কেবল একটি অভিযোগ হিসেবেই থেকে যায়। আর অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে অবশ্যই তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু প্রমাণ না থাকলে একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। গবেষক হিসেবে তাঁর দাবি সেটিও যাচাইযোগ্য ডা. এস এম সরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যান্সারে নিজের বাবাকে হারানোর পর তিনি এই রোগ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা ও চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হয়েছেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বহু রোগীর চিকিৎসা করেছেন এবং অনেক রোগী তাঁর চিকিৎসায় উপকৃত হয়েছেন। এই দাবির ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কত বছর ধরে তিনি গবেষণা করছেন? কী বিষয়ে গবেষণা করেছেন? গবেষণার ফল কোথায় প্রকাশিত হয়েছে? কোন প্রতিষ্ঠান বা গবেষণা-পরিসরে তাঁর কাজ মূল্যায়িত হয়েছে? তাঁর চিকিৎসাপদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী? সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি স্বীকৃত চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোন পর্যায়ে রয়েছে? এগুলো যেমন যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও একই কঠোর মানদণ্ডে যাচাই করা প্রয়োজন। কারও পক্ষে প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ্যে আসুক; কারও বিপক্ষে প্রমাণ থাকলেও সেটিও প্রকাশ্যে আসুক। সত্য কোনো পক্ষের সম্পত্তি নয়। রোগীর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিও চূড়ান্ত প্রমাণ নয় ডা. সরওয়ারের সমর্থনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে তাঁর চিকিৎসায় উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি করা রোগী ও সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোগী কোনো চিকিৎসার পর ভালো অনুভব করলে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বাস্তব অভিজ্ঞতা। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যেমন একা কোনো চিকিৎসাপদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর প্রমাণ করে না, তেমনি কোনো রোগীর মৃত্যু একা চিকিৎসককে ভুল চিকিৎসার জন্য দায়ীও করে না। দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন একই জিনিস নিরপেক্ষ প্রমাণ। এখানেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং দায়িত্বশীল চিকিৎসাবিজ্ঞানের মিল। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি প্রয়োজন একটি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার শক্তি তার ভাষায় নয় তার প্রমাণে। কোনো প্রতিবেদনে যদি রোগীর মৃত্যুকে চিকিৎসকের ভুলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেই সম্পর্কের চিকিৎসাগত ভিত্তি কী—তা স্পষ্ট হওয়া উচিত। যদি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি বা নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। আর অভিযুক্ত চিকিৎসকের বক্তব্য কীভাবে নেওয়া হয়েছে, সেটিও পাঠকের জানার অধিকার। কারণ একটি অভিযোগ প্রকাশ করা এবং একটি অভিযোগ প্রমাণ করা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ‘মিথ্যা সংবাদ’ দাবিরও প্রমাণ প্রয়োজন ডা. সরওয়ার এসব সংবাদকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলেছেন। তাঁর এই দাবিও যাচাইযোগ্য। কোন তথ্য ভুল? কোন বক্তব্য বিকৃত হয়েছে? কোন রোগীর ঘটনা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে? প্রতিবেদনে কী প্রমাণ দেখানো হয়েছে এবং তার বিপরীতে তাঁর কাছে কী নথি রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে এলে বিতর্কটি অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। শুধু ‘সংবাদটি মিথ্যা’ বলা যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি শুধু ‘সংবাদে অভিযোগ এসেছে’ বলেও অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়া যায় না। তদন্ত হোক কিন্তু একপেশে নয় এখন সবচেয়ে যৌক্তিক পথ হলো একটি নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক পর্যালোচনা। রোগীদের চিকিৎসা-নথি, পরীক্ষার রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন, চিকিৎসার সময়কাল, মৃত্যুর কারণ, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি সবকিছু স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যদি ডা. এস এম সরওয়ারের চিকিৎসায় অনিয়ম, অবহেলা বা আইনবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে যদি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকে, কিংবা অভিযোগের সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে সেই বিষয়টিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে আসা উচিত। কারণ জনস্বার্থে সত্য অনুসন্ধান মানে কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়; আবার কোনো ব্যক্তিকে ধ্বংস করাও নয়। শেষ কথা: রায় নয়, আগে প্রমাণ ডা. এস এম সরওয়ার নির্দোষ কি না এই প্রতিবেদনও তার চূড়ান্ত রায় দিতে পারে না। একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও কেবল সংবাদে প্রকাশিত হওয়ার কারণে সত্য হয়ে যায় না। তাঁর চিকিৎসায় রোগী মারা গেলে সেই মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করতে হবে। তাঁর চিকিৎসা ভুল হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডে তা প্রমাণ করতে হবে। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকলে আর্থিক নথি দিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর সংবাদ মিথ্যা হলে কোথায়, কীভাবে এবং কোন তথ্য বিকৃত হয়েছে তারও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে হবে। এখন তাই প্রশ্ন একটাই অভিযোগের শব্দ যতই কঠোর হোক, তার পেছনে প্রমাণ কতটা শক্ত? মানুষের জীবন নিয়ে যেমন অনুমানের সুযোগ নেই, তেমনি একজন চিকিৎসকের পেশাগত জীবন নিয়েও নেই। সত্য উদঘাটনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি। আর সেই পরীক্ষায় যে সত্য টিকে থাকবে, সেটিই শেষ কথা হওয়া উচিত।

