স্টাফ রিপোর্টার
ক্লাস চলাকালে টেবিলে মাথা রেখে শিক্ষিকার ঘুম।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলাকালে টেবিলের ওপর মাথা রেখে এক সহকারী শিক্ষিকার ঘুমিয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও তদারকির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় একজন শিক্ষিকার এভাবে ঘুমিয়ে পড়া দায়িত্ব পালনে গুরুতর গাফিলতির প্রশ্ন তুলেছে। গত রোববার উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের বনগাঁও-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নব
নিতা সিনহা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলাকালে একটি টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় শ্রেণিকক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো অবস্থান করছিল এবং একপর্যায়ে হৈচৈ ও চিৎকার শুরু করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক বিদ্যালয়ে গেলে বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। তাঁরা প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মিনিট শ্রেণিকক্ষের সামনে অবস্থান করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের হৈচৈ-চিৎকারের একপর্যায়ে ওই শিক্ষিকার ঘুম ভাঙে। পরে তিনি শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করেন বলে জানা গেছে। বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্লাস চলাকালে এভাবে ঘুমানো উচিত হয়নি। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষক ঘুমিয়ে থাকার সময় শিক্ষার্থীরা চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন বলেও ওই শিক্ষিকা দাবি করেন। এদিকে ঘটনার সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিতেন্দ্র কুমার সিংহ বিদ্যালয়ে ছিলেন না। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিল দিতে আদমপুর বাজারে গিয়েছিলেন। তবে বিদ্যালয়ের আরেক সহকারী শিক্ষক দাবি করেন, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে গেছেন। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ক্লাস চলাকালে ঘুমিয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষিকা নবনিতা সিনহা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাঁদের বক্তব্য, সন্তানদের নিয়মিত পাঠদান ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার প্রত্যাশায় তাঁরা বিদ্যালয়ে পাঠান। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ঘুমিয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও তদারকি কতটা হচ্ছে, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা। এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুর রহিম বাবর বলেন, ‘ক্লাসে ঘুমানোর কোনো নিয়ম নেই। কোনো শিক্ষক অসুস্থ হলে তিনি ছুটি নিতে পারেন। ভালো না লাগলেও প্রধান শিক্ষককে জানিয়ে ছুটি নেওয়া যায়। অথচ তিনি সেটা না করে ক্লাসে ঘুমিয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, ‘স্কুলে ক্লাস চলাকালে টেবিলে ঘুমানোর কোনো নিয়ম নেই।’ বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে ওই শিক্ষিকাকে ডেকে এনে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যালয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং পাঠদানের পরিবেশও পর্যবেক্ষণ করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও বিষয়টি সামনে এনেছে আরও বড় প্রশ্ন—শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক উপস্থিত থাকলেই কি কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত হয়? নাকি শিক্ষক উপস্থিতির পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের তদারকি এবং দায়িত্ব পালনের মানও নজরদারির আওতায় থাকা প্রয়োজন? অভিযোগটির সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

