কবির হাসান সিলেট প্রতিনিধি:
মক্কার ইমামের ভুল ধরেছিলেন যে বাংলাদেশি সিলেটের আলেম
ইতিহাস কখনো শুধু ঘটনাকে সংরক্ষণ করে না; সংরক্ষণ করে এমন কিছু মানুষের নাম, যাঁদের জ্ঞান ও মেধা ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। সিলেটের কানাইঘাটের আল্লামা মুশাহিদ আহমদ বায়ামপুরী (রহ.) ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রতিভা যাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আরবের আলেমসমাজেও। ১৯৪৭ সালে হজ পালনকালে মক্কার ইমামের খুতবায় একটি ভুল তাঁর নজরে আসে। বিষয়টি তিনি সংশোধনের জন্য তুলে ধরেন। তাঁর গভীর হাদিসজ্ঞান ও অসাধারণ স্মৃতিশক্তিতে তৎকালীন সৌদি আলেমরা মুগ্ধ হয়
েছিলেন এমন বিবরণ তাঁর বিভিন্ন জীবনীতে পাওয়া যায়। এমনকি তৎকালীন সৌদি বাদশাহ তাঁর সামনে রাষ্ট্রীয় সংবিধান পেশ করে কোথাও ভুল বা সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না দেখতে বলেছিলেন বলেও জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। বায়ামপুর থেকে দেওবন্দ—জ্ঞানসাধনার দীর্ঘ পথ ১৯০৭ সালে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বায়ামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.)। শৈশবেই পিতৃহারা হলেও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেমে থাকেনি। মাত্র সাত বছর বয়সে কোরআন শিক্ষা সম্পন্ন করেন। কানাইঘাটে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ভারতে। রামপুর আলিয়া মাদরাসা ও মিরাঠ আলিয়া মাদরাসায় দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৩৬ সালে ভর্তি হন বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে। হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আকাইদ ও দর্শনে গভীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি হাদিসশাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর মেধা ও কৃতিত্বের কথা জীবনীতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষকতা থেকে গড়ে তুললেন এক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান শিক্ষাজীবন শেষ করে ভারতে শিক্ষকতা করলেও শেষ পর্যন্ত সিলেটবাসীর আহ্বানে দেশে ফিরে আসেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ও গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিলা মাদরাসায় শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ সালে নিজ জন্মভূমি কানাইঘাটে ফিরে কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় যোগ দেন। তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে ‘দারুল উলুম কানাইঘাট’ নামে পরিচিত হয়। ১৯৫৪ সালে সেখানে দাওরায়ে হাদিস চালু করেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও শায়খুল হাদিস। তাঁর পাঠদানের খ্যাতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসতেন কানাইঘাটে। একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তিনি যে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন, তা পরবর্তীতে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। শুধু আলেম নন, ছিলেন সমাজের একজন চিন্তাশীল কণ্ঠ আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.)-এর পরিচয় শুধু একজন হাদিসবিশারদে সীমাবদ্ধ ছিল না। কুসংস্কার, অনাচার ও সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। রমজানে সিলেটের বন্দরবাজার জামে মসজিদে তারাবির পর থেকে সাহরি পর্যন্ত তাঁর তাফসির ও আলোচনা শুনতে মানুষের ঢল নামত। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞান, সমাজ ও সমকালীন নানা বিষয় তাঁর আলোচনায় উঠে আসত। রাজনীতিতেও রেখেছেন স্বতন্ত্র পদচিহ্ন শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের পাশাপাশি তিনি সক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতেও। তাঁর শিক্ষক মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও অংশ নেন। সংসদে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আইন, ইসলামি শিক্ষার প্রসার এবং পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরেন। জ্ঞানচর্চার সাক্ষী হয়ে আছে তাঁর গ্রন্থসম্ভার আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.) রেখে গেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। রাজনীতি, তাসাউফ, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ধর্মীয় নানা বিষয়ে তাঁর রচনাগুলো তাঁর চিন্তার গভীরতার পরিচয় বহন করে। ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন আল-ফুরকান বাইনাল হক্বে ওয়াল বাতিল সত্যের আলো ইসলামে ভোট ও ভোটের অধিকার’ এবং সেমাউল কোরআন তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে। শেষ অধ্যায়, কিন্তু রেখে গেলেন অমর উত্তরাধিকার ১৯৭১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৩৯০ হিজরির ১০ জিলহজ ঈদুল আজহার রাতে ইন্তেকাল করেন আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.)। পরদিন ঈদের দিন আসরের পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ছোট ভাই আল্লামা মুজাম্মিল (রহ.) জানাজায় ইমামতি করেন। নিজ হাতে গড়ে তোলা দারুল উলুম কানাইঘাট মাদরাসার সামনেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। একজন মানুষের প্রকৃত উচ্চতা তাঁর পদে নয়, তাঁর জ্ঞানে; তাঁর পরিচয় তাঁর খ্যাতিতে নয়, তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারে। সেই বিচারে আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.) শুধু সিলেটের নন তিনি উপমহাদেশের দ্বীনি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম। মক্কার মিম্বারে ভুল শনাক্ত করার সেই ঘটনা তাঁর পাণ্ডিত্যের একটি আলোচিত অধ্যায় মাত্র; তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব ছিল একটি প্রজন্মকে জ্ঞান, হাদিস ও দ্বীনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে যাওয়া। বায়ামপুরের সেই মেধাবী সন্তান আজ ইতিহাসের অংশ; কিন্তু তাঁর জ্ঞানের উত্তরাধিকার এখনো বেঁচে আছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাঁর ছাত্র এবং তাঁর রচনার পাতায়।

