মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
কমলগঞ্জের ‘আতুরের ঘর’: লোকশ্রুতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক গৌরবময় ইতিহাস।
কমলগঞ্জের ‘আতুরের ঘর’: লোকশ্রুতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক গৌরবময় ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে বয়ে চলা কিছু নাম কেবল ভৌগোলিক পরিচয় বহন করে না, বরং তা কোনো অঞ্চলের দীর্ঘদিনের কৃষ্টি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রার এক জীবন্ত দলিল হয়ে ওঠে। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার লোকসংস্কৃতিতে প্রচলিত তেমনি একটি রহস্যময় ও কৌতূহলোদ্দীপক নাম হলো "আতুরের ঘর" বা "আঁতুড়ঘর"। প্রথম শুনলে একে সাধারণ কোনো ঘর বা স্থান মনে হলেও, প্রামাণ্য ইতিহাস ও ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনের গভীরে প্রবেশ করলে উন্মোচিত হয় এক অন্যর
কম শৈল্পিক ও রাজকীয় উপাখ্যান। নামকরণের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রামাণ্য ইতিহাসটি জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বখ্যাত আগর-আতর শিল্পের সাথে। আঞ্চলিক ভাষার স্বভাবসুলভ টান এবং কালক্রমে উচ্চারণের বিবর্তনে মূলত "আতরের ঘর" শব্দটিই লোকমুখে "আতুরের ঘর"-এ রূপ নিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মৌলভীবাজার জেলা তথা কমলগঞ্জের মাটি ও আবহাওয়া সুগন্ধি আগর গাছের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। মোগল আমল থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০ বছর ধরে এই অঞ্চলে রাজকীয় সুগন্ধি আতর তৈরি হয়ে আসছে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরি’ এবং ১৬৫২ সালের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে এই অঞ্চলের উৎপাদিত আতরের আভিজাত্য ও সুখ্যাতির স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। প্রাচীনকালে এ দেশের অন্যান্য প্রান্তের বা মধ্যপ্রাচ্যের বণিকরা যখন এই জনপদে আসতেন, তখন তারা এই এলাকাটিকে রাজকীয় সুগন্ধির প্রধান ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করে "আতরের ঘর" বা আতরের আবাসস্থল বলে ডাকতেন। সেই ঐতিহাসিক গৌরবই আজ স্থানীয় জনশ্রুতিতে 'আতুরের ঘর' নামে প্রতিধ্বনিত হয়। "মোগল দরবার থেকে আরব উপদ্বীপ—যে সুগন্ধি একদা বিশ্বকে মোহিত করেছিল, কমলগঞ্জের মাটি ছিল সেই রাজকীয় আতরের আপন ঘর। ভাষার বিবর্তনে আজ তা ‘আতুরের ঘর’ নামে এক প্রাচীন স্মৃতির স্মারক।" নামকরণের দ্বিতীয় প্রেক্ষাপটটি বাংলা ভাষার একটি সুন্দর রূপক প্রয়োগের সাথে সম্পর্কিত। বাংলা অভিধান অনুযায়ী "আঁতুড়ঘর" বলতে বোঝায় কোনো নবজাতকের জন্মস্থান কিংবা কোনো মহৎ কৃষ্টি বা শিল্পের আদি সূতিকাগার। এই অর্থে কমলগঞ্জ উপজেলাকে সমগ্র বাংলাদেশের "মণিপুরি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের আঁতুড়ঘর" হিসেবে গণ্য করা হয়। শত শত বছর আগে মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ এসে কমলগঞ্জের মাধবপুর, আদমপুর ও ভানুগাছ এলাকায় তাদের বসতি স্থাপন করেন। মণিপুরি নারীদের হাতের ছোঁয়ায় পরম মমতায় গড়ে ওঠা অনন্য বুননশৈলীর তাঁত শিল্প এই কমলগঞ্জের মাটিতেই জন্ম নিয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত। একই সাথে, বিশ্বখ্যাত মণিপুরি রাসলীলা ও তাদের বর্ণিল লোকনৃত্য ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রবিন্দুও এই অঞ্চল। ফলশ্রুতিতে, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের পরিভাষায় মণিপুরি কৃষ্টির এই মূল উৎপত্তিস্থল বা 'আঁতুড়ঘর' শব্দটিই স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে "আতুরের ঘর" হিসেবে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। আঞ্চলিক ইতিহাসের পাতায় আরেকটি লোকগাথাও প্রচলিত আছে। প্রাচীনকালে জমিদারি বা সামন্ত আমলে ঐতিহ্যগত নিয়ম পালন করার জন্য রাজকীয় বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের কোনো প্রসূতি মায়ের সন্তান প্রসবের পর নদী বা দিঘির পাড়ে সাময়িকভাবে একটি বিশেষ ঘর তৈরি করা হতো। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হতো "আঁতুড়ঘর" বা "আঁতুড়ের ঘাট"। কমলগঞ্জের কোনো প্রাচীন হাওর বা নদী তীরবর্তী অঞ্চলে এমন কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্র ধরেও এই নামের প্রচলন ঘটে থাকতে পারে, যা লিখিত নথিতে না থাকলেও লোকস্মৃতিতে আজো অম্লান। পরিশেষে বলা যায়, কমলগঞ্জের "আতুরের ঘর" কোনো সাধারণ নাম নয়, বরং এটি লোকঐতিহ্যের একটি অপূর্ব মেলবন্ধন। এটি যেমন একদিকে আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই মাটির সুগন্ধি আতরের রাজকীয় আভিজাত্যের কথা, অন্যদিকে তেমনি ফুটিয়ে তোলে মণিপুরি সম্প্রদায়ের বুনন শিল্পের শৈল্পিক সূতিকাগারের গল্প। লোকশ্রুতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এই নামকরণটি কমলগঞ্জ তথা পুরো মৌলভীবাজার জেলাকে বাংলাদেশের মানচিত্রে এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

