মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
পুনর্জাগরণের পথে শমসেরনগর বিমানবন্দর মৌলভীবাজারে স্বপ্নের নতুন উড়ান
দীর্ঘদিনের অবহেলা, নীরবতা ও কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর আবারও আলোচনায় এসেছে মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক শমসেরনগর বিমানবন্দর। দেশের আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগকে নতুনভাবে সক্রিয় করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার শমসেরনগরসহ দেশের মোট আটটি বিমানবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক সম্প্রতি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ এভিয়েশন ট্যুরিজম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এটিজেএ) সদস্যদের সঙ্গে এক সৌজন্য
সাক্ষাতে তিনি সরকারের এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এরপর থেকেই মৌলভীবাজারজুড়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত এই জেলার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী মহল ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও প্রত্যাশা। শমসেরনগর বিমানবন্দর শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো নয়; এটি মৌলভীবাজার অঞ্চলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে ব্যবহৃত এই বিমানবন্দর বহু বছর ধরে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে ছিল। ফলে আকাশপথে যাতায়াতের জন্য মৌলভীবাজারবাসীকে নির্ভর করতে হয়েছে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর। এতে সময়, খরচ ও ভোগান্তি—সবকিছুরই চাপ বহন করতে হয়েছে সাধারণ যাত্রীদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, শমসেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত মৌলভীবাজারের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী সহজেই নিজ জেলার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন। এতে যেমন সময় সাশ্রয় হবে, তেমনি যাত্রাপথের ভোগান্তিও কমে আসবে। অন্যদিকে দেশের অন্যতম পর্যটননির্ভর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চা-বাগান, পাহাড়ি বনাঞ্চল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাওর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই অঞ্চল প্রতি বছর হাজারো পর্যটককে আকর্ষণ করে। কিন্তু সরাসরি বিমান যোগাযোগ না থাকায় অনেক পর্যটক বিকল্প গন্তব্য বেছে নেন। বিমানবন্দর সচল হলে পর্যটন শিল্পে নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুধু পর্যটন নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও বাড়বে গতি। চা শিল্পনির্ভর এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা দ্রুত সময়ে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন। এতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হবে। বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, শমসেরনগরের পাশাপাশি দেশের আরও কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় সচল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বগুড়া, ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, কুমিল্লা ও পটুয়াখালী বিমানবন্দর। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এসব বিমানবন্দর চালুর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার লক্ষ্য সরকারের। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন থেকে বের হয়ে আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বিমানবন্দর কেবল যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতি, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও কাজ করে। তবে শুধু ঘোষণা নয়, দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। অতীতে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি—এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে সাধারণ মানুষের। তাই এবারও ঘোষণাটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। মৌলভীবাজারবাসীর প্রত্যাশা, শমসেরনগর বিমানবন্দর আবারও চালু হলে বদলে যাবে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ চিত্র। প্রবাসী, পর্যটক, ব্যবসায়ী—সবার জন্যই এটি হয়ে উঠতে পারে স্বস্তি ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কবে বাস্তবে আকাশে আবারও উড়বে শমসেরনগরের বিমান।

