মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারে মাদ্রাসাছাত্রের শ্বাসনালি কেটে দিল সন্ত্রাসীরা , আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি
মৌলভীবাজার শহরের কুসুমবাগ এলাকায় টাউন কামিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসান আহমদ (১৫)-এর ওপর নৃশংস হামলার অভিযোগ উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে। হামলাকারীরা চাকু দিয়ে তার গলার শ্বাসনালি কেটে দেওয়ার পাশাপাশি নাকে আঘাত করে মুখ থেঁতলে এবং বুকের পাঁজর ভেঙে দিয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সর্বশেষ তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হও
য়ায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পরিবার। বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহরের কুসুমবাগ এলাকার পিউরিয়ার সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত হাসান আহমদ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের গয়ঘর এলাকার মিন্টু মিয়ার ছেলে। সে মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো বুধবার রাতে শহর থেকে বাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছিল হাসান। কুসুমবাগ এলাকায় পৌঁছালে একই এলাকার কয়েকজন কিশোর তাকে আটকে দেয়। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ সময় চাকু দিয়ে হাসানের গলায় আঘাত করা হয়। এতে তার শ্বাসনালি কেটে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরিবারের অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে সড়কে ফেলে রেখেও মারধর চালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসান কাতরাতে থাকলেও হামলাকারীরা তাকে ছাড়েনি। নাক ও মুখে আঘাত করে তাকে গুরুতর জখম করা হয়। একই সঙ্গে বুকের পাঁজরেও আঘাত করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। পরে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসানকে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। পরে তাকে দ্রুত মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। হাসানের চাচা পাপলু পারভেজের দাবি, পূর্ববিরোধের জেরেই এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, একই এলাকার আলিম মিয়ার ছেলে ছানি নামের এক কিশোরের সঙ্গে হাসানের বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ‘ছোট ভাই’ ও ‘বড় ভাই’ সম্বোধনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ছানি হাসানকে ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করতে চাপ দিত বলে পরিবারের দাবি। পাপলু পারভেজ বলেন, ঘটনার দিনও এ বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। হাসান বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পরে ছানি, তাওহিদ ও রনিসহ কয়েকজন কিশোর হাসানের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত কিশোরেরা এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হামলার ধরন ও নৃশংসতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে প্রকাশ্যে আটকে রেখে এভাবে গুরুতর জখম করার ঘটনায় শহরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, তাদের হাতে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে হাসানের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাসানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বৃহস্পতিবার রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তার শ্বাসনালি ও শরীরের অন্যান্য স্থানে গুরুতর আঘাত রয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি বলেন, পূর্ববিরোধের জেরেই হাসানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়েছে। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। একজন কিশোরের সঙ্গে আরেক কিশোরের কথাকাটাকাটি কীভাবে এমন ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিল—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের হাতে ধারালো অস্ত্র এলো কীভাবে এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কতটা কার্যকর—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা, দ্রুত উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে হাসান সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক। আর এমন নৃশংসতার সঙ্গে জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

