মৌলভীবাজার/রাজনগর প্রতিনিধি
কুশিয়ারা নদী লুটে নিচ্ছে কারা?
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ১নং ফতেহপুর ইউনিয়নের কুশিয়ারা নদীতে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দিনের পর দিন নদীর বুক চিরে বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। নদী রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং তীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন অংশ থেক
ে নিয়মিতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদীভাঙন, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বসতবাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচিত বেড়কুড়ী গ্রামের জমসেদ মিয়া, হামিদপুর গ্রামের রিপন মিয়া এবং সাদাপুর গ্রামের রহিম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি অভিযোগের ভিত্তিতে রাজনগর তহসিল অফিসের কর্মকর্তা সাদেক মিয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি বালু উত্তোলনের বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে অভিযোগ রয়েছে, উপস্থিতদের মধ্যে জমসেদ মিয়া বলেন, ডিসি ও ইউএনওকে বলুন, আমাদের অনুমতি আছে।স্থানীয়দের দাবি, এ ঘটনার পর তহসিল কর্মকর্তা সেখান থেকে চলে যান। এরপরও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি; বরং আগের মতোই কার্যক্রম চলতে থাকে। এই বক্তব্যকে ঘিরে এলাকায় নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। যদি সত্যিই বৈধ অনুমতি থেকে থাকে, তবে সেই অনুমতি কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছে, কী ভিত্তিতে দিয়েছে এবং তার নথিপত্র কোথায়এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চান স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যদিকে, যদি কোনো অনুমতি না থাকে, তাহলে প্রকাশ্যে নদী থেকে বালু উত্তোলনের পরও কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সে প্রশ্নও এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, কুশিয়ারা নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি এ অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে, ভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে এবং ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এলাকাবাসী আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অভিযান বা কঠোর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে তাদের দাবি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল কুমার সাহার সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেলের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ারও চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। এদিকে কুশিয়ারা নদীকে অবৈধ বালু উত্তোলনের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নদীর পরিবেশ রক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক এবং রাজনগর উপজেলা প্রশাসন বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। কুশিয়ারা নদীকে রক্ষা করা শুধু একটি নদীকে বাঁচানো নয়; বরং হাজারো মানুষের জীবিকা, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার দায়িত্বও বটে।

